গোয়ালঘরে অন্ধ মা, উদ্ধার করলেন ইউএনও

মা-বাবা সন্তানদের আদর-যত্নে বড় করে তোলেন যেন বৃদ্ধ বয়সে তারা একটু শান্তিতে থাকতে পারেন। সন্তানদের কাছ থেকে পায় দু মুঠো ভাত। আর তা পেলেই মা-বাবা খুশি থাকেন। কিন্তু এমনও সন্তান আছে যারা মা-বাবাকে অবহেলা আর অযত্নে রাখেন।
এমনই এক উদাহরণ ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার বাঘড়ি গ্রামের তাহের মল্লিকের স্ত্রী সরবানু। তিন ছেলে আর দুই মেয়ে নিয়ে সুখের সংসার ছিল তার। কিন্তু সেই সুখ তার কপালে সইলো না। ঠাঁই হলো গোয়ালঘরের একটি ভাঙা চৌকিতে।

এরইমধ্যে সরবানুকে নিয়ে একটি সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে টনক নড়ে উপজেলা প্রশাসনের। সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখে তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেন ইউএনও মো. সোহাগ হাওলাদার।

বৃহস্পতিবার দুপুরে সরবানুকে তিনি রাজাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। বর্তমানে সরবানু চিকিৎসাধীন আছেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, সরবানুর শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। কিন্তু তার চেতনা আছে। তার কথায় তিনি অভিজাত পরিবারের মেয়ে মনে হয়েছে। তাকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা হচ্ছে।

ইউএনও মো. সোহাগ হাওলাদার বলেন, বৃদ্ধার বিষয়ে আমি জানতে পেরে দেখতে গিয়েছি। তার স্মরণশক্তি ভালো। বংশীয় পরিবারের সন্তান তিনি। কিন্তু অশিক্ষা বা অসচ্ছলতা যেটাই বলুন, তার সন্তানদের অবহেলা ও অবজ্ঞার জন্যই তার এ দুরবস্থা। পিঁপড়ার কামড়ে জর্জরিত হয়ে সেখানে দিন কাটাচ্ছিলেন। যখন পায়ে ব্যথা পেয়েছিলেন, তখন যদি মায়ের প্রতি ভালোবাসার টানে সন্তানরা সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতেন, চিকিৎসা করাতেন, তাহলে এ দুর্ভোগ হতো না তার। তাকে বর্তমানে রাজাপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা চলছে।

১০ বছর আগে সরবানু হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে যান। এতে কোমর ও পায়ে ব্যথা পান তিনি। ব্যথানাশক ট্যাবলেট খেয়ে প্রাথমিক চিকিৎসায় ভালোই ছিলেন কিছুদিন। অর্থের অভাবে ছেলেরা তাকে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারেননি। ধীরে ধীরে অচল হয়ে যান সরবানু। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখে কিছুই দেখছিলেন না তিনি। সেই থেকে অন্ধ হয়ে যান তিনি। এরপর থেকে সন্তানরাও তাকে দূরে সরিয়ে দেন।

নিজে একা একা চলতে পারেন না, বিছানাতেই মলমূত্র ত্যাগ করতে হয় তাকে। সামর্থ্যহীনতা আর সদিচ্ছার অভাবে ছেলেরা একদিন মাকে রেখে আসেন বসতঘরের পাশের পরিত্যক্ত গোয়ালঘরে, একটি ভাঙা চৌকিতে। জরাজীর্ণ ওই গোয়ালঘরেই সরবানুর প্রায় তিন বছর কেটেছে। আধা পেট আর বিনা চিকিৎসায় তার প্রতিদিন অতিবাহিত হচ্ছিল।

প্রতিবেশী আকলিমা আক্তার সেলিমা বলেন, মশার কামড়, গরম কিংবা শীতে এখানেই পড়ে থাকতেন সরবানু। ঘরটি বসবাসের অযোগ্য। মানুষটা অন্ধ, অচল। তার সন্তানরা সচ্ছল নন; কিন্তু মায়ের সেবা তো করতে পারেন। তা না করে দুর্গন্ধে বিরক্ত হয়ে ওই ঘরে রেখে এসেছিলেন তাকে।