শখের বসে ইউটিউব চ্যানেল খুলে ৪১ লাখ সাবস্ক্রাইবার

By | March 5, 2022

রান্নার আয়োজনে পুরো গ্রামের মানুষ। তাদের মধ্যে একদল পেঁয়াজ-রসুনের খোসা ছড়ানোর কাজ করছেন। আরেকদল মাছ-মাংস ধোয়ার কাজে ব্যস্ত। একেক দলের ভাগে পড়েছে একেক দায়িত্ব।

কাটাকুটির পর এবার রান্না চড়িয়ে দেওয়ার পালা। এক পর্যায়ে রান্নাও শেষ হয়। এবার গ্রামসুদ্ধ মানুষের দলবেঁধে খাওয়ার আয়োজন। বিশাল সব কর্মযজ্ঞ। দেখে মনে হবে কোনো বিয়ে বা বড় কোনো অনুষ্ঠানের জন্য এসব আয়োজন। কিন্তু না, এসব আয়োজন ‘অ্যারাউন্ড মি বিডি (AroundMeBD)’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলকে ঘিরে।

বলছিলাম কুষ্টিয়ার প্রত্যন্ত একটি গ্রাম খোকসার ‘ইউটিউব গ্রাম’ শিমুলিয়ার কথা। ইউটিউবই ইন্টারনেট জগতে বিশেষ পরিচিত এনেছে এই গ্রামকে। এজন্য ‘ইউটিউব গ্রাম’ নামেই এখন পরিচিত কুষ্টিয়ার শিমুৃলিয়া। কুষ্টিয়া শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী জেলার সীমান্তে গ্রামটির অবস্থান।

মূলত গ্রামীণ পরিবেশে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে রান্নাবান্না এবং খাওয়া-দাওয়ার ভিডিও আপলোড করা হয় এ চ্যানেলে। এখন পর্যন্ত চ্যানেলটির ভিউ হয়েছে প্রায় ১৩৩ কোটি ৬৫ লাখ ২৮ হাজার ২৪৮ বার।

বর্তমানে চ্যানেলটির সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা প্রায় ৪১ লাখ। ২০১৬ সালের জুন মাসে প্রকৌশলী লিটন আলী খান ও স্থানীয় স্কুলশিক্ষক দেলোয়ার হোসেন যৌথভাবে ‘অ্যারাউন্ড মি বিডি’ নামের এই ইউটিউব চ্যানেলটি চালু করেন।

চ্যানেলটি শুরুর দিকে গ্রামীণ পরিবেশে সব রান্নাবান্না, শিশুদের নিয়ে গ্রামীণ পরিবেশে বনভোজনের আয়োজন, খালে-বিলে মাছ ধরার দৃশ্য ভিডিও ধারণ করে তা তুলে ধরা হতো। সে সময় মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ভিডিও চিত্র ধারণ করে মেমোরি কার্ডের মাধ্যমে ভিডিও ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হতো। ঢাকায় পৌঁছানোর পর লিটনের হাত ঘুরে সেসব ভিডিও আপলোড করা হতো ইউটিউব চ্যানেলে।

বর্তমানে আশাতীত সাফল্য পেয়েছে চ্যানেলটি। এখন আর মোবাইলে ভিডিও চিত্র ধারণ করা হয় না। ভিডিও চিত্র ধারণের জন্য ব্যবহার হরা হয় একাধিক ক্যামেরা। রয়েছেন চারজন ক্যামেরাম্যান। এখন শুধু নারীদের রান্না করার ভিডিও দেখানো হয় এই চ্যানেলে।

চ্যানেলটির যাত্রা শুরুর গল্প প্রসঙ্গে উদ্যোক্তাদের একজন স্থানীয় মোল্লাপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রকৌশলী লিটন সম্পর্কে তার ভাগনে। ঢাকায় ব্যবসা দেখাশোনা করেন। আজ থেকে কয়েক বছর আগে রাজধানী ঢাকাতে লিটনের অফিসে বসে সাংস্কৃতিক রাজধানী খ্যাত কুষ্টিয়া জেলাকে নিয়ে কিছু করা যায় কি না এ নিয়ে আলোচনা হয়। সেই আলোচনা থেকে উঠে আসে ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে গ্রামীণ সব কৃষ্টি-কালচার তুলে ধরার। পরিকল্পনা করা হয় গ্রামের মানুষজনকে নিয়ে রান্নাবান্না করার ভিডিও ধারণ করে আমরা তা ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরবো। সেই থেকে আমাদের চ্যানেলের যাত্রা শুরু।’

একটি থেকে এখন তাদের ইউটিউব চ্যানেলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচটিতে। একেকটি চ্যানেলে গ্রামনির্ভর একেক ধরনের বিষয়বস্তু তুলে ধরা হয়।

চ্যানেলটির পরিচালক দেলোয়ার হোসেন আরও বলেন, প্রতিমাসে সব মিলিয়ে তাদের সাত থেকে আট লাখ টাকা ব্যয় হয়ে থাকে। আর মাসে অন্তত ২০ দিন চ্যানেলটির জন্য ভিডিও ধারণ করা হয়।

চ্যানেলটির মূল উদ্যোক্তা লিটন আলী পেশায় একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) পড়াশোনা করেছেন। রাজধানীর মিরপুরে যৌথ মালিকানায় তার তথ্যপ্রযুক্তির প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কথা হয় লিটনের সঙ্গে।

লিটন জানান, গ্রামে এলেই স্থানীয় তরুণ-যুবকরা তাদের জন্যও কিছু করার কথা বলতেন। গ্রামবাসীদের কথা মাথায় রেখেই শুরুতে অনেকটা শখের বশেই ইউটিউব চ্যানেলটি খোলা হয়। পরে আয়ের বিষয়টি মাথায় আসে। তখন থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ‘অ্যারাউন্ড মি বিডি’ চ্যানেলের কাজ।

তিনি আরও জানান, প্রথম দিকে কিছুদিন নিজেরাই পকেটের টাকা খরচ করে রান্নার আয়োজন করতেন। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত শিমুলিয়া গ্রামে বসে ধারণ করা এসব ভিডিও সম্পাদনার কাজ হয়ে আসছে ঢাকায়। শুরুর মাত্র কিছুদিনের মধ্যেই গ্রামীণ জীবনের ভিডিওগুলো ভাইরাল হয়ে যায়।

বিদেশি রান্না বিষয়ক জনপ্রিয় অনেক ফেসবুক পেজে শেয়ার হতে থাকে অ্যারাউন্ড মি বিডির ভিডিও। নিভৃত পল্লী খোকসার শিমুলিয়া গ্রামে ছুটে আসেন ‘বেস্ট এভার ফুড রিভিউ শো’ চ্যানেলের পর্যালোচক সানি সাইড।

দেশের মধ্যে যারা খাবার নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করেন তাদের মধ্যে অনেকে গ্রামে আসেন। হু হু করে বাড়তে থাকে চ্যানেলের গ্রাহকসংখ্যা (সাবস্ক্রাইবার)। একই সঙ্গে, এই ইউটিউব চ্যানেলেও আয় বাড়তে থাকে। কিন্তু শুরুর দিকে তাদের এই কাজকে নিয়ে অনেকেই নানান কটূকথা বলতেন। তবে এখন গ্রামবাসীরাই তাদের কাজের প্রেরণা। সবাই মিলেমিশে তারা এখন আনন্দ উপভোগ করেন।

চ্যানেলটির দর্শকদের বড় একটি অংশ ভারতের। আছে যুক্তরাষ্ট্রেও। লিটন আলী জানান, কোন দেশ থেকে ভিডিও দেখা হচ্ছে, সেটাও আয়ের ওপর যথেষ্ট প্রভাব ফেলে।

জানান, চ্যানেলটির আয় থেকেই রান্নাবান্নার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা, চারজন ভিডিওগ্রাফার, রাঁধুনিসহ প্রায় ৫০ জন মানুষের বেতন ও সম্মানীর ব্যবস্থা হয়। গ্রামের উন্নয়ন, অসুস্থ ও অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতা করা হয়।

ইউটিউব চ্যানেলকে ঘিরে স্বপ্নের কথা জানিয়ে লিটন আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘পরিকল্পনা ছাড়াই কাজ শুরু করেছিলাম। এখন গুছিয়ে কাজ করছি। ভবিষ্যতে শুধু বিচিত্র বিষয়গুলো নিয়ে চ্যানেল খোলার ইচ্ছা রয়েছে।’

ইউটিউব চ্যানেলকে ঘিরে গ্রামীণ জিনিসপত্র দিয়ে শিমুলিয়া গ্রামে তৈরি করা হয়েছে একটি থিমপার্ক। বাঁশ-খড় দিয়ে তৈরি করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন হাতি, কচ্ছপ, ডাইনোসর। পুকুরের মধ্যে তৈরি করা হয়েছে ঘর। সহজ, সরল গ্রামীণ জনপদের মানুষকে একটু আনন্দ দেওয়ার জন্য নিজেদের প্রচেষ্টায় যতটা করা সম্ভব, সবই যেন করা হচ্ছে এই ‘ইউটিউব গ্রামে’।

স্থানীয় গ্রামবাসীরা জানান, যেদিন রান্নাবান্না হয় সেদিন খুব আনন্দ হয় তাদের। সকাল থেকে রান্না কাজ শুরু হয়। বিকেলে গ্রামের শত শত মানুষ একসঙ্গে বসে খান। আর একেক সময় একেক আয়োজন থাকে। পোলাও, বিরিয়ানি, গরু, খাসি, মুরগির মাংস, বড় মাছ, ছোট মাছ, ডিমসহ বিভিন্ন রকমের খাবার পরিবেশন করা হয়।

এই চ্যানেলের জন্য যেসব নারীরা রান্নার কাজ করছেন তাদের সবাই গৃহিণী। আছেন বউ-শাশুড়িও। ইউটিউব চ্যানেলটি ঘিরে এখন অনেকেরই উপার্জনের পথ তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত পোশাক পরে তারা রান্নাবান্না করেন।

তাদেরই একজন রাশিদা বেগম। যিনি চার বছর ধরে এই চ্যানেলের জন্য কাজ করছেন। রাশেদা জানান, স্বামীর উপার্জনের পাশাপাশি এখন নিজের বাড়তি উপার্জনের ফলে বাচ্চাদের লেখাপাড়া ও হাতখরচে সুবিধা হয়।

এই চ্যানেলে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা আরেকজন রেহেনা খাতুন বলেন, ‘আমরা সবাই একসঙ্গে গল্পে গল্পে রান্নাবান্না করি। আবার একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করি। এই কাজে আমাদের খুব আনন্দ হয়।’

‘অ্যারাউন্ড মি বিডি’ ইউটিউব চ্যানেলের কল্যাণে শিমুলিয়া গ্রাম এখন দেশ-বিদেশে আলোচিত। দূর-দূরান্ত থেকে এই গ্রামে ছুটে আসে মানুষ।

চ্যানেলটির বিশেষত্ব হলো কোনো উপস্থাপনা ছাড়াই রান্নাবান্নার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াই শৈল্পিকভাবে ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। নেই কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকও। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ধারণ করা ভিডিওগুলোর প্রত্যেকটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মন্ত্রমুগ্ধের মতো উপভোগ করেন উৎসুক দর্শকরা। তাই আপনিও একটু সময় নিয়ে ঢুঁ মেরে আসতে পারেন ‘অ্যারাউন্ড মি বিডি’ ইউটিউব চ্যানেলে।